লোহাগড়ার মুক্তিযুদ্ধঃ কালনায় যুদ্ধে পরাজিত পাকসেনারা ধংসযজ্ঞ চালায়

0
11
লোহাগড়ার মুক্তিযুদ্ধঃ মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসলে পাকবাহিনী ও রাজাকারদের চলাচল সীমিত হয়ে যায়
লোহাগড়ার মুক্তিযুদ্ধঃ মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসলে পাকবাহিনী ও রাজাকারদের চলাচল সীমিত হয়ে যায়

এ্যাডঃ আবদুস ছালাম খান

১৯ নভেম্বর ১৯৭১। লোহাগড়ার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি স্মরণীয় দিন। মুক্তিযুদ্ধের সময় লোহাগড়া থানার কালনায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক সেনাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। আর এটিই ছিল পাক সেনাদের সাথে লোহাগড়ার মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সফল ও একমাত্র সম্মুখ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাকসেনাদের চরম পরাজয় হয়েছিল। লোহাগড়া ও ভাটিয়াপাড়ার মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিল অন্ততঃ ১০ পাক সেনা। সহযোদ্ধাদের হারিয়ে জীপগাড়ী চালিয়ে দ্রুত বেগে পালিয়ে জীবন রক্ষা করেছিল তাদের দলনেতা। সহযোদ্ধারা নিহত হবার পর দলনেতা জিপ গাড়ী থেকে ব্রাশ ফায়ার করতে করতে দ্রুত বেগে লোহাগড়ার দিকে পালিয়ে আসে।

মুক্তিযোদ্ধারা পালিয়ে আসা জীপ গাড়ী খানিকে ধাওয়া করে পিছু পিছু দৌড়ে লোহাগড়া সিএন্ডবি ঘাট পর্যন্ত আসে। মুক্তিযোদ্ধারা ঘাটে পৌছানোর আগেই জীপ গাড়িটি নদী পার হয়ে যেতে সক্ষম হয়। কালনায় প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ শুনে আমি বাড়ি থেকে মাঠ আড়াআড়ি কালনার দিকে যাচ্ছিলাম। ততক্ষণে কালনায় গোলাগুলি থেমে গেছে। তখন সিএন্ডবি রাস্তা দিয়ে সর্বোচ্চ গতিবেগে পালিয়ে আসা জীপ গাড়ি খানিকে যেতে দেখে আমার মনে হচ্ছিল ওরা মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে বেঁচে আসলেও এখনই হয়তো দুর্ঘটনায় পড়ে প্রাণ হারাবে। এসময় মাঠ আড়াআড়ি ওই পথে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে দৌড়ে আসতে দেখে আমিও তাদের অনুসরণ করে দ্রুত কুন্দশী সিএন্ডবি ঘাটের দিকে ফিরে এলাম। প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ দৌড়ে আসা মুক্তিযোদ্ধরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তথাপিও পাকসেনারা পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে ফিরে আসতে পারে এ আশঙ্কায় মুক্তিযোদ্ধারা পরবর্তী করণীয় নিয়ে তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত নিতে বসে।

মুক্তিযোদ্ধারা অনুমান করেছিল রাতের আগেই হয়তো পাকসেনারা পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে কালনায় অভিযান চালাতে পারে। ধারণা করা হয়েছিল এতক্ষণে নিশ্চয়ই পালিয়ে আসা সৈনিকটি যশোর ক্যান্টনমেন্টে জানিয়ে দিয়েছে। তাই মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের পরবর্তী হামলা ঠেকাতে স্থানীয় গ্রামবাসীদের ডেকে নবগঙ্গা নদীর এপার বরাবর বাংকার খুঁড়ে প্রতিরোধ ব্যুহ তৈরির কাজে সহযোগিতার আহবান জানায়। ওই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ইতনার জালাল ফকির ও মহিশাহপাড়ার মতিয়ার রহমান পূর্ব থেকেই আমার পরিচিত। তাদের কথায় আমিও বাংকার খুঁড়তে আগ্রহী হলাম এবং অন্যান্যদের সাথে কুন্দশী জেলে পাড়ার মধ্যে বাংকার খোঁড়ার কাজে লেগে গেলাম। বাড়ি থেকে কোদাল ও খোন্তা নিয়ে গেলাম। রাতভর আমরা কুন্দশী থেকে লোহাগড়া বাজার পর্যন্ত অন্ততঃ ৫০টির মত ছোটবড় বাংকার খোঁড়ার কাজে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করলাম। কুন্দশী গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাতের খাবার নিয়ে এলাম। আর্মি পার হতে পারলে প্রথমেই কুন্দশী গ্রামে আক্রমণ চালাবে এবং তাতে গ্রামের কেউ রেহাই পাবে না। এ আশঙ্কায় গ্রামের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহায়তা দেয়। মুক্তিযোদ্ধারাও আর্মিদের প্রতিহত করতে সব ধরণের প্রস্তুতি নেয়। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু ওই রাতে আর পাক আর্মি লোহাগড়ায় আসে নাই। বরং জীপসহ পালিয়ে আসা সেই পাক সেনাটিও যশোর চলে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাকসেনারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে পরের দিন লোহাগড়ায় অভিযান চালায়।

কালনা যুদ্ধের পরদিন অর্থ্যাৎ রমজান মাসের শেষে ঈদের দিন। কুন্দশী থেকে কালনা পর্যন্ত কোন বাড়িতে ঈদের আনন্দ নেই। কালনা যুদ্ধে পরাজিত পাক আর্মিরা তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে যে কোন সময় হামলা চালাতে পারে সেই আশংকায় ভীত-সন্ত্রস্থ এ কয় গ্রামের মানুষ। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ রাতেই বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ অবস্থানে চলে গেছে। ২০ নভেম্বর ১৯৭১ রোজ শনীবার সকাল ৭ টা হবে। কোন কোন বাড়িতে ঈদের ক্ষীর-পায়েস রান্না শুরু হয়েছে। হঠাৎ সিএন্ডবি ঘাটের ওপার অর্থ্যাৎ লক্ষীপাশা থেকে ভারী মেসিন গানের ব্রাস ফায়ার। ৫/১০ টা গুলি নয়। মনে হলো একবারে মেসিন গানের শ‘খানেক গুলি কুন্দশী গ্রামের উপর এসে পড়লো। ভারী মেসিন গানের আওয়াজে পাক সেনাদের প্রস্তুতি কতটা শক্তিশালী তা অনুমান করা গেল। মুক্তিযোদ্ধাদের সারা রাতের প্রতিরোধ প্রস্তুতি ম্লান হয়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যুদ্ধংদেহী পাক সেনাদের মোকাবেলা করার মত ভারী অস্ত্র না থাকায় তারা ব্রাস ফায়ারের পাল্টা জবাব না দিয়ে বাংকার ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের তো সম্মুখ যুদ্ধ করার কথা নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের রণনীতি ছিল শত্রুর ঘাঁটিতে আকষ্মিক আক্রমণ করা । পারলে শত্রুর ঘাঁটি দখল অথবা শত্রু সৈন্য ধংস করা অন্যথায় নিরাপদে ফিরে আসা। তারা ‘হিট এন্ড রান’ অর্থ্যাৎ গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের বাংকার ছেড়ে চলে যেতে দেখে ২/১ জন গ্রামবাসী যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ছিলাম তারাও দ্রুত পালিয়ে গেলাম। যেসব বাড়িতে ঈদের ক্ষীর-পায়েস রান্না শুরু হয়েছিল তা চুলার পরে রেখেই যে যার মত দৌড়ে পালিয়ে যায়। তবে পাকসেনারা সিএন্ডবি ঘাট পার হয়ে সোজা কালনার দিকে চলে যায়। কোথাও তাদের কোন প্রতিরোধের মোকাবেলা করতে হয় নাই। মুক্তিযোদ্ধাতো দুরের কথা কোন সাধারণ মানুষও এইসব এলাকায় ছিল না। পাক সেনারা গত দিনের যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পারে এটা আগে থেকেই গ্রামবাসীরা ধরেই নিয়েছিল। পাকসেনারা চরকালনা গ্রামের সেই স্থানে পৌছে ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং ব্যাপক অগ্নি সংযোগ শুরু করে।

পাক সেনাদের সাথে অনেক রাজাকার ছিল। রাজাকাররা পাকসেনাদের গ্রামের পথঘাট চিনিয়ে নিয়ে যায়। ওরা সারাদিন চর কালনা থেকে শুরু করে কালনা , কামঠানা তেতুলিয়া হয়ে কুন্দশী পর্যন্ত রাস্তার পার্শ্বের প্রতিটি গ্রামে ব্যাপক লুঠ-পাঠ ও অগ্নি সংযোগ করে। আগুনের লেলিহান শিখা অনেক দুর থেকে দেখা যাচ্ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের হামলা করার সুযোগ পেয়েও নরপশুদের হিংস্রতায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমান আরো বৃদ্ধি পেতে পারে এ আশংকায় কাছাকাছি অবস্থান করলেও কোথাও কোন প্রতিরোধ করে নাই। মুক্তিযোদ্ধারা কোনভাবে পাকসেনাদের উপর যে কোন ধরণের আক্রমন করলে পাল্টা গোলাগুলি হতে পারে সেই আশংকায় আমরা সারাদিন সিএন্ডবি রাস্তার কাছাকাছি আসি নাই।

বিকালের দিকে শোনা গেল পাক আর্মিরা কুন্দশী সিএন্ডবি ঘাট পার হচ্ছে। তখন দ্রুত সিএন্ডবি ঘাটের দিকে আসি। তখনও কুন্দশী গ্রামের কয়েকটি বাড়িতে আগুন জ্বলছিল। আমরা প্রথমে কুন্দশীর হারান মালোর বাড়ির বসত ঘরে লাগানো আগুন দেখতে পাই। ওই বাড়িতে বসতঘরে লাগানো আগুনে ঘর পুড়ে সেই আগুন ঘর সংলগ্ন বড় একটি আম গাছে ধরে যায়। আমগাছটিতে তখনও আগুন জ্বলছিল। পাশে রাজকুমার সাহার বাড়িতে টালির ঘরে আগুন দেয়া হয়েছে। পার্শ্ববর্তী আরো কয়েকটি বাড়িতেও আগুন জ্বলছিল। উপাই সিকদারের বাড়িতে গিয়ে দেখি কয়েকটি ঘরে তখনও আগুন জ্বলছে। বসতঘর সংলগ্ন মুরগি ও পায়রার খোপ পুড়ে গেছে। বাড়ির লোকেরা সকালে ব্যস্ত হয়ে পালানোর সময় মুরগি ও পায়রার খোপ দু‘টি খুলে দেবার কথা কারো মনে ছিল না। তাই পায়রা ও মুরগি গুলি বের হতে না পেরে পুড়ে গেছে। মুরগি ও পায়রা গুলি পুড়ে মাংস পিন্ড হয়ে গেছে। সে দৃশ্য আজও আমার স্মৃতিপটে সমুজ্জল। লেখা চলবে। (লেখক -সিনিয়র আইনজীবী ও সাংবাদিক)