লোহাগড়ার মুক্তিযুদ্ধঃ মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসলে পাকবাহিনী ও রাজাকারদের চলাচল সীমিত হয়ে যায়

0
6
লোহাগড়ার মুক্তিযুদ্ধঃ মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসলে পাকবাহিনী ও রাজাকারদের চলাচল সীমিত হয়ে যায়
লোহাগড়ার মুক্তিযুদ্ধঃ মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসলে পাকবাহিনী ও রাজাকারদের চলাচল সীমিত হয়ে যায়

এ্যাডঃ আবদুস ছালাম খান

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক সেনারা লোহাগড়ায় স্থায়ী কোন ক্যাম্প বা কোন ঘাঁটি স্থাপন করে নাই। এমনকি লোহাগড়া থানায়ও ওরা স্থায়ীভাবে অবস্থান নেয় না। লোহাগড়া থানার পূর্ব সীমান্তবর্তী মধুমতি নদীর ওপারে কাশিয়ানী থানার ভাটিয়াপাড়া নামক স্থানে থাকা অধুনালুপ্ত অয়্যারলেস স্টেশন ঘিরে গড়ে ওঠা সেনা ক্যাম্প থেকেই মুলতঃ ওরা এ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতো। এই সেনা ঘাঁটি থেকেই পাক সেনারা মধুমতি নদীর দুই পাড়ের গ্রামগুলিতে নিয়মিত হামলা চালাতো। মধুমতি নদীতে লঞ্চ বা গানবোট-স্পীডবোটসহ বিভিন্ন নৌযানে দক্ষিণ দিকে বড়দিয়া পর্যন্ত এবং উত্তর দিকে আলফাডাঙ্গাÑমহম্মদপুর থানা পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামে হামলা চালাতো। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে অর্থ্যাৎ মে মাসের প্রথমদিকে পাকসেনারা প্রথম লোহাগড়া অভিযানে আসে। যশোর সেনানিবাস থেকে আসা পাক সেনাদল লোহাগড়া অভিযানে আসতে কোন প্রতিরোধের সন্মুখিন হয় নাই।

তবে পাকসেনারা লোহাগড়া অভিযানের এই দিনের পূর্বে লোহাগড়া আসতে গিয়ে নড়াইল-লোহাগড়া রাস্তার হাওয়াইখালি ব্রিজে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র প্রতিরোধের সন্মুখিন হয়। এদিন পাকসেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধদের তুমুল যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে যাওয়ার পর পরবর্তীতে আর কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে নাই। প্রথম এ অভিযানের দিনেই ওরা লোহাগড়া বাজারে কর্মরত একজন শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করে এবং বাজারের বড় চারটি দোকান পুড়িয়ে দেয়। পাক সেনারা এদিন অসংখ্য ছোট-বড় দোকান লুঠ করিয়ে দেয়। তবে এদিন পাকসেনাদের একটি দল কুন্দশী গ্রামে গেলেও গ্রামের কোন ক্ষয়ক্ষতি করে নাই।

অভিযান শেষে পুরো সেনাদল আবার যশোরে ফিরে যায়। এদিকে ভাটিয়াপাড়া সেনা ক্যাম্পের সৈন্যরা মে মাসের মাঝামাঝির দিকে লোহাগড়া থানার তেতুলিয়া ,কালনা-কামঠানা ও মোচড়া গ্রামে হামলা চালিয়ে ৫/৬জন লোককে গুলি করে হত্যা করে এবং কয়েকটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। মে মাসের ১৫তারিখে লোহাগড়া থানার ইতনা গ্রামে হামলা চালিয়ে চারজন লোককে গুলি করে হত্যা করে। পাকসেনারা মে মাসের ২৩ তারিখে ইতনায় হামলা চালিয়ে প্রায় ৫০ জনের মত লোক হত্যা করে। যা ইতনা গণহত্যা নামে আজও দেশবাসীর কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। পাকসেনারা একইভাবে মধুমতি নদীর পাড়ের আরো কয়েকটি গ্রামে মাঝে মাঝে হামলা চালালেও তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় নি। বরং তারা বিনা বাঁধায় অপারেশন চালিয়ে নিরাপদে ফিরে গেছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপস্থিতির সুযোগেই পাকসেনাদের এভাবে হামলা চালিয়ে নিরাপদে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধারা দেশে ফিরে আসার পর পাকসেনাদের চলাচল সীমিত হয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসার আগে অবশ্য নকশালরা থানা আক্রমন করেছিল। তিনদিনের যুদ্ধে নকশালরা থানা দখলের কাছাকাছি গেলেও নড়াইল থেকে অতিরিক্ত রাজাকার এসে পড়ায় তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে পরবর্তীতে রাজাকার-পুলিশের উপর খন্ড খন্ড আক্রমণ চালানোর মধ্য দিয়ে তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। ।

সেপ্টেম্বর মাসে ট্রেনিং শেষে মুক্তিযোদ্ধারা দেশে ফিরে আসতে থাকে। লোহাগড়া বাজার থেকে তখন সবেমাত্র বর্ষার পানি সরে গেছে। লক্ষিপাশা-লোহাগড়া খেয়া পারাপার তখনও স্বাভাবিক হয় নাই। লোহাগড়া বাজারের মুরগী হাটার কোণা থেকে অর্থ্যাৎ তৎকালের জয়পুর খেয়াঘাট থেকে লক্ষিপাশা বাজার সোজা সীমিত আকারে খেয়া পারাপার চালু হয়েছে। মে মাসে বাজার লুট ও পুড়িয়ে দেবার পর লোহাগড়ায় তখনও বাজার বসে না। লক্ষিপাশায় কালিবাড়ির সামনে তখন নিয়মিত বাজার বসতো। এসময় একদিন জরুরী প্রয়োজনে লক্ষিপাশা কালিবাড়ির সামনের বাজারে যাই। আমার সাথে হিরু ভুইয়া নামে আমার এক বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয় ছিল। লক্ষিপাশা বাজার বলতে তখন কালিবাড়ির সামনের ওই বাজারটিকে বোঝাতো। খেয়া নৌকাটি কালিবাড়ি বাজারে গিয়ে আমাদের নামিয়ে দেয়। আমরা নামার সাথে সাথেই দেখি একজন রাজাকার লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে এসে ঘোষণা দিচ্ছে ৫ মিনিটের মধ্যে বাজারে কোন লোক থাকবে না।

আমরা কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখি মুহুর্তের মধ্যেই বাজার ফাঁকা হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা কি করি। যে খেয়া নৌকায় পার হয়ে গেছি সেটা ওই ঘোষণায় মুহুর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এসময় দেখি লক্ষিপাশার বেপারী পাড়ার সোনা বেদে নামে এক ব্যক্তি তার ছোট একখানি ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে দ্রুত ছেড়ে আসছে। আমরা তাকে অনুরোধ করায় সে আমাদের নিয়ে আসতে রাজী হলো। কিন্তু তার নৌকাটি এত ছোট যে সে সহ আমার সাথী হিরু ভুইয়া ও আমি নৌকায় উঠায় নৌকাটি ডুবু ডুবু হয়ে যায়। প্রাণের ভয়ে নড়াচড়া না করে কোনমতে নৌকায় বসে পার হয়ে এলাম। সোনা মিয়া আমাদের নিয়ে বর্তমানের দুধ বাজারের কোনায় নামিয়ে দিল। আমরা নৌকা থেকে নেমে নিতাই কুন্ডুর বইয়ের দোকানের (অর্পণা স্টোর) সামনে আসতেই দেখি একদল মুক্তিযোদ্ধা। তাদের একজনের হাতে এল এম জি এবং বাকীদের হাতে এসএলআর ও এসএমজি। তারা আমাদের দেখে এগিয়ে এসে জানতে চাইলো ওপারে কি দেখে এলাম। তখন আমরা তাদের সবকিছু জানালাম। আমরাও বুঝে গেলাম রাজাকাররা কেন ৫ মিনিটের মধ্যে লক্ষিপাশা বাজার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। ওই মুক্তিযোদ্ধাদের লোহাগড়া বাজারে উপস্থিতির খবর যেভাবেই হোক রাজাকারদের কাছে পৌছে গেছে। তাই ভীত-সন্ত্রস্থ রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনের ভয়ে দ্রুত বাজার ফাঁকা করে দেবার নির্দেশ দিয়েছিল।

এদিকে ভাটিয়াপাড়া ক্যাম্পের পাকসেনাদের উপর প্রায়ই মুক্তিযোদ্ধরা আক্রমন চালাতো। দফায় দফায় আক্রমন চালিয়ে তাদের বিপর্যস্থ করে তোলা হয়। সেপ্টেম্বরÑঅক্টোবর মাসে অন্ততঃ ৪ বার মুক্তিযোদ্ধারা ভাটিয়াপাড়া সেনা ক্যাম্প আক্রমন করে। মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্পে আক্রমন চালালে পাকসেনারা সঙ্গে সঙ্গেই যশোর সেনানিবাসে জানিয়ে দিতো। যশোর থেকে ৪ খানা যুদ্ধ বিমান উড়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর মেসিন গানের বেপরোয়া গুলি বর্ষণ করে ছত্রভঙ্গ করে দিত। যুদ্ধ বিমানগুলি ভাটিয়াপাড়া ক্যাম্পে আক্রমনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের টার্গেট করে লোহাগড়া থানার মোচড়ার সোজা উপরে উঠে সেখান থেকে ক্রমে নীচু হয়ে (ঈগল পাখি ছোঁ মেরে মুরগীর বাচ্চা শিকারের ন্যায়) উড়ে গিয়ে ভারী ম্যাসিনগান দিয়ে গুলি বর্ষণ করতো। এভাবে কয়েকবার গুলি বর্ষণ করার পর মুক্তিযোদ্ধরা পিছু হটে গেলে বিমানগুলি আবার যশোরে ফিরে যেত। যুদ্ধবিমানের গুলি বর্ষণের সে দৃশ্য যেহেতু আগে কখনো দেখিনি। তাই বিমান আক্রমণ হলেই আমাদের কুন্দশী গ্রামের মাঠের খৈ বাবরার বাগানের মধ্যে বসে জঙ্গী বিমানের গুলি বর্ষণের সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখতাম। জঙ্গী বিমানের গুলি বর্ষণের সে দৃশ্য দেখে মনে হতো যেন আমাদের একেবারে কাছ থেকেই গুলি করা হচ্ছে।

ভাটিয়াপাড়া ক্যাম্পে আক্রমন করা ছাড়াও এসময় পাকসেনাদের চলাচলের উপরও বিভিন্নভাবে বাধার সৃষ্টি করা হয়। নদীপথে বের হলেই মুক্তিযোদ্ধারা তাদের উপর গেরিলা কায়দায় (হিট এন্ড রান) আক্রমন চালাতো। মুক্তিযোদ্ধারা মধুমতি নদীতে পাক সেনাদের পেলেই আক্রমন করে বসতো। অক্টোবর মাসের দিকে মহিশাহপাড়া গ্রামের নুরমিয়া নামে আমার একজন আতœীয় সবেমাত্র ভারত থেকে মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে এসেছে। পাংখারচর গ্রামের একইবাড়ির দুই ভাইয়ের সাথে আমাদের দুজনের বোন বিয়ে দেয়া। সে হিসাবে একদিন সে আমাকে বলেÑ চলো পাংখারচর যাই। আমি তার কথায় রাজী হয়ে গেলাম। তার কাছে নতুন একটা এসএলআর এবং একটা হ্যান্ড গ্রেণেড। আমরা পাংখারচর আত্মীয় বাড়িতে পৌছানোর আগেই ওই গ্রামের সোজা মধুমতি নদীতে প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। গুলির শব্দ শুনে ও খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে ঘটনাস্থলে পৌছানোর জন্য। সে বারবার বলছে তোমার জন্য দেরী হয়ে গেছে। তখন আমার বুঝতে বাকী রইলো না এই যুদ্ধের জন্যই ও আমাকে পাংখারচর নিয়ে এসেছে। পরে জানতে পারি ওর সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধারা পাংখারচর সোজা মধুমতি নদী দিয়ে যাওয়া পাকসেনা ভর্তি লঞ্চে আক্রমন করতে পাংখারচর আসতে বলেছিল।

মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনের জবাব দিতে ভীত-সন্ত্রস্ত পাকসেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের একটা গুলির বিপরীতে অন্ততঃ ২০টি গুলি করে। ওরা চাইনিজ রাইফেলের গুলি ছাড়াও মাঝে মাঝে মর্টার থেকে শেল নিক্ষেপও করেছিল। মর্টার শেল আমাদের কাছাকাছি রাস্তার পার্শ্বের ডোবার পানিতে পড়তে দেখে ও আমাকে নিয়ে মাটির রাস্তা আড়াল রেখে নিরাপদ পজিশনে শুয়ে পড়ে। ও যেহেতু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা তাই যুদ্ধে আতœরক্ষার কৌশল ওর জানা । কিন্তু আমি। আমার তো কোন প্রশিক্ষণ নেই। আমাদের পিছনেই রাস্তার ড্রেনের পানিতে গুলি পড়তে দেখে আমি কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। এ সময় ও বলে নদীর দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তখন আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বাধা দেই। কিছু সময় গুলি বিনিময়ের পর যখন গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল না তখন আমরা উঠে আত্মীয় বাড়ির দিকে যাই। মুক্তিযুদ্ধকালে এটি আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা। এভাবে মুক্তিযোদ্ধারা বারবার আক্রমণের মাধ্যমে পাকসেনাদের চলাচল সীমিত করে ফেলে। লেখা চলবে। (লেখক সিনিয়র আইনজীবী ও সাংবাদিক )