গৌরীপুর হানাদার মুক্ত দিবস ৮ ডিসেম্বর

0
12
গৌরীপুর হানাদার মুক্ত দিবস ৮ ডিসেম্বর
গৌরীপুর হানাদার মুক্ত দিবস ৮ ডিসেম্বর

হলি সিয়াম শ্রাবণ

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম দিকে গৌরীপুর শহর ছাড়া সমস্ত এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় পাক হানাদার বাহিনী ৭ ডিসেম্বর দিনগত রাতে শহর ছেড়ে রেলযোগে গৌরীপুর থেকে পালিয়ে যায়। ওইদিন রাতেই মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানী কমান্ডার রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধার নিকট গৌরীপুর থানায় অবস্থানরত পুলিশ ও রাজাকাররা আত্মসমর্পন করে। এই খবর মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে শহরের মুক্তি পাগল জনতা জয় বাংলা ধ্বনিতে গৌরীপুরের আকাশ মুখরিত করে তোলে এবং প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়ে বরণ করে নেন বাংলার দুর্জয় সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের।

গৌরীপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুর রহিম জানান, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর এপ্রিলের প্রথম দিকে গৌরীপুরে শুরু হয় পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম পর্যায়ের সংগ্রাম। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা ও এমসিএ মরহুম হাতেম আলী মিয়া ও গৌরীপুর মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আলী হাসানের তত্ত্বাবধানে ১৭টি রাইফেল দিয়ে শুরু হয় স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষন। তাঁদেরকে সহযোগিতা করেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক মোঃ মমতাজ উদ্দিন।

পাক বাহিনীর হামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল কিশোরগঞ্জ থেকে রেল পথে পাক হানাদার বাহিনী গৌরীপুরে প্রবেশ করে। হানাদার বাহিনী গৌরীপুরে প্রবেশ করেই শুরু করে হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। ওই দিন সকাল থেকেই পাকিস্থানী জঙ্গি বিমান গৌরীপুরের আকাশে টহল দিয়ে থেমে থেমে আকাশ থেকে রেলস্টেশন, কলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা লক্ষ করে গুলি বর্ষন করে। হানাদার বাহিনী গৌরীপুর শহরে প্রবেশ করে কালীপুর মোড়ে গুলি করে হত্যা করে স্কুল শিক্ষক ব্রজেন বিশ্বাসকে।

হানাদার বাহিনী গৌরীপুর দখলের পর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে যান। এসময় একে একে সবাই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিব বাড়ীতে আশ্রয় নেন এবং ট্রেনিং নিতে শুরু করেন। এদিকে গৌরীপুরে পাক হানাদার বাহিনী সাধারন মানুষের উপর চালায় নির্মম অত্যাচার। ১৬ মে সকালে হানাদার বাহিনী শালীহর গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে যায় বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক মধূ সুদন ধরকে এবং শহর থেকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কৃষ্ণ সাহাকে। তাঁরা আজো ফিরে আসেনি।

হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগস্ট মাসে গৌরীপুরে অবস্থানরত পাক বাহিনীর উপর হামলা শুরু করে প্রশিক্ষন প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা। এসময় তাঁরা হানাদারদের চলাফেরা ও যোগাযোগ ব্যর্থ করে দিতে বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেন যোগাযোগের মাধ্যম টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও রেল সেতু। অগ্নিসংযোগ করে ধ্বংস করেন রেলস্টেশন ও পাটগুদাম।

এদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের চোরাগোপ্তা হামলায় পাক বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং শালীহর গ্রামে প্রবেশ করে গণহত্যা শুরু করে। সেখানে ১৪ জনকে গুলি করে হত্যা করে এবং ধরে নিয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আবুল হাসেমের পিতা ছাবেদ হোসেনকে। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ৩০ নভেম্বর পলাশ কান্দায় পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন জসিম উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম, আনোয়ারুল ইসলাম মনজু ও মতিউর রহমান। শ্যামগঞ্জে শহীদ হন সুধীর বড়ুয়া।
অবশেষে ডিসেম্বরের প্রথম দিকে গৌরীপুর শহর ছাড়া সমস্ত এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় পাক হানাদার বাহিনী ৭ ডিসেম্বর দিনগত রাতে শহর ছেড়ে রেলযোগে গৌরীপুর থেকে পালিয়ে যায়। ওইদিন রাতেই মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানী কমান্ডার রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে আবুল কালাম আজাদ, আঃ হেকীম, নজরুল ইসলাম, সোহরাব, ছোট ফজলু, আনসার, কনুসহ একদল মুক্তিযোদ্ধার নিকট গৌরীপুর থানায় অবস্থানরত পুলিশ ও রাজাকাররা আত্মসমর্পন করে। এই খবর মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে শহরের মুক্তি পাগল জনতা জয় বাংলা ধ্বনিতে গৌরীপুরের আকাশ মুখরিত করে তোলে এবং প্রানঢালা অভিনন্দন জানিয়ে বরণ করে নেন বাংলার দুর্জয় সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার মোঃ নাজিম উদ্দিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধে গৌরীপুরে যাঁদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে তাঁদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম হাতেম আলী মিয়া (এমসিএ), মরহুম ডাঃ এম এ সোবহান, মরহুম মোঃ খালেদুজ্জামান, যুদ্ধকালীন ১১নং সাব-সেক্টর কমান্ডার মরহুম তোফাজ্জল হোসেন চন্নু ও মুজিব বাহিনীর কমান্ডার মরহুম মজিবুর রহমানের নাম অন্যতম।