মেধাশ্রম: যে শ্রমে ঘাম ঝড়ে না

0
16

মনদীপ ঘরাই

শ্রমিকদের অধিকার আদায়, বঞ্চনা আর ইতিহাসের লেখায় আজ মে দিবস কানায় কানায় পূর্ণ। একটু ভিন্ন চিন্তা নিয়েই লিখতে বসা। শ্রম শব্দটার সাথে আনুষ্ঠানিক পরিচয় ক্লাস ফোরে বা তারও কিছু পরে। “শ্রমের মর্যাদা” রচনার মাধ্যমে। শ্রমের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে শ্রমিকের নাম, শ্রমিকের ঘাম। তাই শ্রম বলতে কায়িক শ্রমকেই নিজেদের মাঝে গেঁথে নিয়েছি। তাই তো নেয়া উচিত। শ্রমিকের কষ্ট, ত্যাগ আর বঞ্চনার ইতিহাস পর্বত সমান। শ্রমিকের ইতিহাস কালে কালে পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই, তবে বঞ্চনা মুছে যায় নি পুরোপুরি। তাই আজও মে দিবস এলেই শ্রমিকের অধিকার নিয়ে ভাবতে হয় সঙ্গত কারণেই।

কায়িক শ্রমের মাধ্যমে যারা সভ্যতাকে গড়ে তুলেছেন, লালন-পালন করছেন, তাদের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা। এবার মূল প্রসঙ্গে যাই। শ্রমের আগে কায়িক বিশেষন বিশেষণ ব্যবহার করেছি মানেই বুঝতে পেরেছেন, শ্রমের অন্য কোন ধরণ নিয়েও আলাপ এগোতে চাচ্ছি। ধরণটা হলো মেধাশ্রম। এই শব্দটা আজকের দিনে একটু বেখাপ্পা ঠেকতে পারে। তবে, এসব নিয়ে কথা বলার দিন তো আজই।

সরকারী-বেসরকারী চাকরি, ব্যবসা, সাংস্কৃতিক কর্ম, সাংবাদিকতা,শিক্ষকতা, ফ্রি ল্যান্সিং,কিংবা কোন পেশায় না থাকায় বেকারত্ব… এসবের সাথে কোন শ্রম মিশে আছে কি? খুব ভেবে চিন্তে বের করতে হবে। সারাটাদিন অফিস সেরে যখন বাসায় আসি, ক্লান্তি ভর করে আমাকেও। কেউ যদি সেই ক্লান্ত আমায় জিজ্ঞেস করে, কি করলে সারাদিন?

উত্তরটা কি দেব? কয়েকটা মিটিং, দশ বারোটা ফাইল আর গোটা দশেক ইমেইল! এ কথা শুনে প্রশ্নকর্তা নির্ঘাত ভাববে, কাজ না করেই এরা ক্লান্ত হয়! কাজ না করে কথাটার মাঝে এই ‘কাজ’ শব্দটা নির্দেশ করে কায়িক শ্রমকেই। কায়িক শ্রমের অনুপস্থিতিতেও খাটছে আমাদের মস্তিস্ক। নিচ্ছে সিদ্ধান্ত, লিখছে-লেখাচ্ছে, খবর বানাচ্ছে, পাঠদান করছে, চিকিৎসা দিচ্ছ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। মস্তিষ্কের এই কায়িক শ্রমই হলো মেধাশ্রম, যা বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জীবন ধারণের উপজীব্য।

একজন ব্যাংকারকে জিজ্ঞেস করুন, কি খবর? উত্তর পাবেন, “প্রচুর খাটা-খাটনি যাচ্ছে।” একজন চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করুন, কেমন আছেন, হয়তো সে বলবে “ব্যস্ততায় নির্ঘুম কাটছে রাত।” একজন সাধারণ কর্মচারীকেই জিজ্ঞেস করুন না, জীবন কেমন কাটছে, উত্তর মিলবে “মরারও সময় নেই।”

এই যে ব্যস্ততা, এই যে খাটা-খাটনি, কিংবা সময়ের অভাব এর সাথে কায়িক শ্রমের সংযোগ খুব একটা মিলবে না। কত কিলোজুল কাজ হলো, পদার্থবিজ্ঞানের সে সূত্রে গেলে আমাদের এক কথায় অপদার্থ হয়েই যেতে হবে। তাহলে আমরা করছি টা কি? দিচ্ছি মেধাশ্রম। মেধার সাথে আবার শ্রম মেলালাম কোন বুদ্ধিতে?

তাহলে এবার একটু ব্যাখ্যায় যাই। ধরুন টিভিতে একটা সংবাদ দেখছেন। যে সংবাদকর্মী এই সংবাদটি তৈরি করেছেন, তাকে সারাদিন থাকতে হয়েছে ফিল্ডে। এরপর সংবাদ প্রস্তুত এবং শেষমেষ আসলো স্ক্রিনে। আপনার দেখা স্ক্রিনের সংবাদে সারাদিনের পরিশ্রমের কথা কি স্মরণে রইলো? মনে হয় না।

আমাদের কথাই ধরুন। মাঠ প্রশাসনে থাকতে একটা তদন্ত করতে দেখা গেল সারাদিন বাইরে বাইরে। অফিসে এসে রিপোর্ট প্রস্তুত করার পর যখন ফাইলবন্দী হয়, তখন নিতান্তই “নথিজাত” হয়ে যায় সারাদিনের পরিশ্রম। হয়ে যায় এক টুকরো রিপোর্ট। একজন চিকিৎসক অপারেশন থিয়েটারে ঘন্টার পর ঘন্টা। সূক্ষ্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ মানবদেহে যখন শুভ উদ্দেশ্যে কাঁটাছেঁড়া করেন, সেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটা আর কাজ থাকে না। নাম হয় “ডিউটি” একজন সঙ্গীত শিল্পীর গানটা আপনার কানে প্রবেশ করে। বছরের পর বছর সকাল বিকেলের সাধনা থেকে যায় আড়ালে।

আর যারা প্রাইভেট জব করেন, তাদের কাজের পেছনে রয়ে যায় ঝুঁকি। চাকরির নিশ্চয়তার ঝুঁকি। চকচকে গোছানো জীবন দেখি আমি-আপনি। ঝুঁকিটা রয়ে যায় আড়ালে। একজন সাহিত্যের শিক্ষক হাজারো হৃদয়ে মননশীল বীজতলা তৈরি করছেন। দিন শেষে সে কাজের হিসেব দিতে পারবেন?

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে অনলাইন ফ্রি ল্যান্সিং এ জীবন গড়ছেন অনেকই। এই যে হাজার হাজার ওয়েবসাইট রয়েছে চোখের সামনে। এগুলো বানানোর পেছনের মস্তিষ্কের খাটনি নিশ্চিত আমার আপনার চোখের আড়াল হয়েছে। নিরাপদে আপনি যখন ঘুমাচ্ছেন, তখন পুলিশের কোন এক সদস্য টহল দিচ্ছে নির্ঘুম। আমাদের চোখের আড়ালে।

এসব শ্রম ঘাম ঝড়াচ্ছে না ঠিকই; তবুও করছে ক্লান্ত; শ্রান্ত। আমাদের মস্তিষ্ক খেটেই চলেছে। অবিরাম। যে শ্রম দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, পরিমাপ করা যায় না দৃশ্যমান কাজের পরিমান দিয়ে। তবুও শ্রমিকদের কায়িক শ্রমের সাথে এই মেধাশ্রমের মিশেল না হলে গড়ে উঠতো কি কোন সভ্যতা? হতো কি কোন উন্নয়ন? সম্ভব হতো আমাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন? তাই, সকল কায়িক শ্রম ও মেধাশ্রমের অবদান রেখে চলা মানুষগুলোকে মহান মে দিবসের শুভেচ্ছা জানাই।