অবশেষে নড়াইলে দেড় মাস পর কলেজে ফিরলেন অধ্যক্ষ

0
11
অবশেষে নড়াইলে দেড় মাস পর কলেজে ফিরলেন অধ্যক্ষ
অবশেষে নড়াইলে দেড় মাস পর কলেজে ফিরলেন অধ্যক্ষ

স্টাফ রিপোর্টার

শিক্ষাদানের মহান ব্রত নিয়ে যিনি দীর্ঘ ২৬টি বছর কাজ করেছেন, তিলে তিলে কলেজটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে অনুপ্রাণিত করেছেন, পথপ্রদর্শক হয়ে কাজ করেছেন, আলোর দিশা দেখিয়েছেন সেই শিক্ষককে কিছুদিন আগে তারই কিছু ছাত্রনামধারী তরুণ জুতার মালা গলায় পরিয়ে কলেজ থেকে বের করে দিলেও আজ সেই শিক্ষককে তারাই আবার বরণ করে নিয়েছে ফুলের মালা গলায় দিয়ে। ছাত্র-ছাত্রীরা বলেছেন শিক্ষক জাতির মেরুদন্ড। সেই শিক্ষককে অপমান করা মানে গোটা জাতিকেই অপমান করা। বুধবার (৩ আগস্ট) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সদরের মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস নড়াইল থেকে কলেজ গেটের সামনে পৌছালে তাঁকে ছাত্র-ছাত্রী, এলাকাবাসী এবং কলেজের শিক্ষকরা বরণ করে নেন। পরে অধ্যক্ষকে তাঁর কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন নড়াইল-১ আসনের এমপি কবিরুল হক মুক্তি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি দলের সদস্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুস সালাম হাওলাদার, রেজিস্ট্রার মোঃ মাহমুদ আল হোসেন, কলেজ মনিটরিং ও মূল্যায়ন কমিটির পরিচালক রফিকুল আকবর, আইন বিভাগের পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস, মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট অচিন চক্রবর্ত্তী, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার অ্যাডভোকেট এস.এ মতিন, মুক্তিযোদ্ধা সাইফুর রহমান হিলু, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সেলিম আহমেদ, সদর থানার ওসি (চলতি দায়িত্বে) মাহামুদুর রহমান, স্থানীয় বিছালী ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ হেমায়েত হুসাইন প্রমুখ।

কলেজে প্রবেশের প্রাক্কালে অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস সাংবাদিকদের কাছে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ১৮ জুন কয়েক ষড়যন্ত্রকারী যে ঘটনা ঘটিয়েছে তা ভুলে যেতে চাই। সমাজে ষড়যন্ত্রকারির সংখ্যা হাতে গোনা, ভালো মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। সমাজে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠিত হবেই। এ ঘটনার পর জেলা ও পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আমাকে শান্তনা দিয়েছেন। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। দেশবাসির প্রতি কৃতজ্ঞ। আজ সবাই যেভাবে আমাকে সম্মান দেখিয়েছে তাতে আমি অভিভূত। আমি নিজেকে ধন্য ও গর্বিত মনে করছি। তিনি ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ সপরিবারে নিহত সকল শহীদদের স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আমি সবার সহযোগিতা নিয়েই কলেজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করবো।

অধ্যক্ষ কলেজে কয়েক ঘন্টা অবস্থান করে তার নিজ গ্রাম পাশর্^বর্তী বড়কুলায় যান। সেখানে মা বনলতা বিশ্বাস-বাবা সুমন্ত বিশ্বাস, স্ত্রী ও স্কুল ও কলেজ পড়–য়া ৩ কন্যা রয়েছেন। ১৮জুনের পর বুধবারই প্রথম বাড়িতে ফিরলেন। এ ঘটনার পর তিনি নড়াইল শহর ও শহরতলিতে বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।

নড়াইল-১ আসনের এমপি কবিরুল হক মুক্তি বলেন, অসাম্প্রদায়িক নড়াইলে আগে কখনও এ ধরণের ঘটনা ঘটেনি। এ অনাকাংখিত ঘটনার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। ধর্মান্ধতা এখন সমাজে ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে। এটা শুধু বাংলাদেশেই নয় সারা বিশে^ একই অবস্থা। আগে পাড়ায় পাড়ায় জারিগান, কবিগান হতো। এখন হয়না। এজন্য সমাজে সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি দলের সদস্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুস সালাম হাওলাদার বলেন, আমরা এসেছি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির দ্বারা নির্দেশিত হয়ে কলেজের অধ্যক্ষের আগমনকে স্বাগত জানাতে। তিনি যাতে সসম্মানে নিজ চেয়ারে বসতে পারেন সে বিষয়ে অভিনন্দন এবং সম্মান জানাতে এসেছি।

অধ্যক্ষের আগমনের প্রতিক্রিয়া জানাতে কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মুক্তা বিশ্বাস, তোনিয়া খানম ও তিথি বিশ্বাস বলেন, পিতা-মাতার পরেই শিক্ষকের স্থান, শিক্ষক জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষক একটি জাতি গঠন করেন। সেই শিক্ষকের অপমান মানে গোটা জাতির অপমান। আজ যেভাবে আমরা স্যারকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিলাম তাতে স্যারের হয়তো কিছুটা লজ্জা লাঘব হবে। আমরা চাই না এ ধরনের ঘটনা দেশের আর কোথাও না ঘটুক। আমরা অনেক আনন্দিত স্যার কলেজে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন। তিনি আগে যেভাবে কলেজে এসেছেন, ক্লাস নিয়েছেন, হাসি খুশি থেকেছেন এখন থেকে ঠিক সেভাবেই কলেজে আসবেন এবং আমাদের মাঝে অবস্থান করবেন।

এদিকে কলেজের একাদশ শ্রেণির এহসান আহম্মেদ, মেহেদী হাসান, ইব্রাহীম শেখসহ কয়েক ছাত্র বলেন, অধ্যক্ষ স্যারের আগমনে আমরা সবাই অত্যন্ত আনন্দিত। ঘটনার দিন অধমরা শুরু রাহুলকে পোস্টটি ডিলিট করতে বলেছিলাম। সে তা না করায় আমরা তার বিচার চেয়েছি। কিন্তু যারা এ ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে অধিকাংশই তারা মাদ্রাসার ছাত্র এবং বাইরের মানুষ। কিন্তু পুলিশ কলেজের ৪জন নির্দোষ ছাত্রকে গ্রেফতার করেছে। তারা ৪জনের মুক্তির দাবি জানিয়েছে । ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের গেস্খফতার করে শাস্তির আওতায় আনা হোক। গ্রেফতারের ভয়ে এবং আতংকে অধিকাংশ ছাত্রই কলেজে এসে ক্লাস করতে পারছে না তারা জানান।

প্রসঙ্গত, মির্জাপুর কলেজের এক ছাত্র ফেসবুকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে কটুক্তিকারী ভারতের বিজেপির বহিস্কৃত নেত্রী নূপুর শর্মাকে প্রনাম জানিয়ে মির্জাপুর কলেজের এক ছাত্রের পোস্ট দেয়ার ঘটনায় কলেজ ক্যাম্পাসে ১৮জুন এক সহিংস ঘটনার পর কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরিয়ে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ ৩৬দিন কলেজ বন্ধ থাকার পর গত ২৪ জুলাই কলেজ খুললেও অধ্যক্ষ কলেজে যাননি। এমনকি অধ্যক্ষ পাশর্^বর্তী গ্রাম বড়কুলার নিজ বাড়িতেও ফেরেননি।

অধ্যক্ষ হেনস্থা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সদর থানার ওসি (চলতি দায়িত্বে) মো. মাহামুদুর রহমান জানিয়েছেন,এ পর্যন্ত মোট ৯জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরা সবাই হাজতে। এর মধ্যে মির্জাপুর কলেজেরই ছাত্রই রয়েছেন ৪জন। এ ৪জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভিডিও ফুটেজে তাদের কর্মকান্ড দেখে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে অভিযুক্ত পোস্টকারী কলেজ ছাত্র রাহুল এখন হাজতে।