নড়াইলে ‘অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী’ কুলে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন

3
2
নড়াইলে ‘অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী’ কুলে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন
নড়াইলে ‘অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী’ কুলে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী’ নতুন জাতের আপেল কুল চাষ করে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন নড়াইলের তরুণ উদ্যোক্তা রাকিবুল ইসলাম রাকিব। একই সঙ্গে কুল চাষে অনেকেরও ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তিনি । ২০২১ সাল। অর্থনীতিতে স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্র রাকিব। তরুণ উদ্যোক্তা ইউটিউবে কুলের বাগান দেখে উৎসাহিত হয়ে ৬৯ শতক পৈত্রিক জমিতে কুলের চাষ শুরু করেছেন। চারা রোপনের মাত্র ৬ মাসের মাথায় লাখ লাখ টাকার ফলন দেখে জীবন বদলের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০-২০০ কেজি কুল বিক্রয় করছেন। দিন যতই যাচ্ছে, কুলের চাহিদা ততই বাড়ছে। এলাকার অনেক ছাত্র-ছাত্রী, যুবক ও কৃষকরা প্রতিদিনই এই কুল বাগানটি দেখতে আসছেন। এই জেলায় তিনিই প্রথম এই অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী চাষ শুরু করেন।

জেলার লোহাগড়া উপজেলার এড়েন্দা গ্রামের কৃষক বাবা জহর শেখের কৃষি সফল ছেলে রাকিব। রাকিবের বাগান দেখে কুল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন অনেক বেকার যুবক। এ মৌসুমে তার বাগানের প্রতিটি গাছে অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী আপেল কুল ছেঁয়ে আছে। ফলের ভারে গাছসহ ডালগুলো নিচের দিকে নুয়ে পড়েছে। বাঁশের খুঁটি দিয়ে আগলে রাখা হয়েছে প্রতিটি গাছ। পাখি ও চোরের হাত থেকে কুল রক্ষায় পুরো বাগান চারপাশে জাল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এ ধরনের কুল চাষ করে রাকিব এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছেন। ব্যতিক্রমী একটি ফল চাষ করে আজ তার মুখে ফুটেছে সাফল্যের হাসি।

রাকিব জানান, চকরি নামক সোনার হরিণের আশায় বসে না থেকে ছাত্রজীবন থেকেই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার তাগিদে নানা ধরনের চেষ্টা করেন তিনি। সিদ্ধান্ত নেন, কৃষি কাজে মনোনিবেশ করবেন। সামান্য পূঁজি, সততা আর পরিশ্রম দিয়েই শুরু করেন চাষবাস। গত বছরের মার্চ মাস থেকে অনলাইনের মাধ্যমে মেহেরপুর জেলার মুজিব নগর থেকে ৪০০টি কুলের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। রাকিব ও তার ৪-৫ জন শ্রমিক অক্লান্ত পরিশ্রম ও পরিচর্যায় মাত্র ৬ মাসের মাথায় সবকটি গাছেই কুল ধরেছে। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন প্রতিটি গাছে ঝুলছে পাকা কুল। কুল বেচে ভাগ্য বদলানোর আশায় রাকিবের মুখে হাসি ফুটেছে। তিনি আশা করছেন, প্রায় পাঁচ লাখ টাকার অধিক বল সুন্দরী কুল বিক্রি করতে পারবেন। তবে এ কুল চাষে তেমন খরচ নেই বলে জানান তিনি। শুধু চারা সংগ্রহ করতেই একটু সমস্যা। রাকিবের কুল বাগান এখন এলাকায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। ছাত্রাবস্থায় বাগানের কুল বিক্রি করে নিজের পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে পরিবারকে সহায়তা করছেন। এছাড়া রাকিবের কুল বাগানে কবির শেখ,আবু কালাম ও সাজ্জাদসহ ৫-৭ টি পরিবারের কর্মসংস্থান হয়েছে।

বাগান দেখতে গিয়ে কথা হয় রাকিবের সঙ্গে। এ সময় আলাপকালে তিনি বলেন, ‘ফেইসবুক ও ইউটিউব দেখে উদ্যোগ নেই আমি। কিশোর মনের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে আর বিলম্ব করিনি। সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৬৯ শতাংশ জমিতে ৪০০টি চারা দিয়ে অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী কুল চাষ শুরু করি। এই অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী কুল চাষে সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু মুনাফার পরিমাণ অনেক বেশি। ভাবিনি এতো ফলন হবে। প্রতি কেজি কুল প্রথম দিকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি করি। বর্তমানে পাইকারী ৬০-৭০ টাকা এবং খুচরা মূল্য-৮০-৯০ টাকা দরে বিক্রি করছি। চাহিদা বেশি থাকায় খুচরা বাজারে তোলার আগেই বাগান থেকেই বিক্রি হচ্ছে কুল। ইনশাল্লাহ্ আগামীতে আরো ৬ একর জমি লীজ নিয়ে শিক্ষিত যুবক মাহফুজুল ইসলাম সম্রাট ও আহাদুজ্জামান সোহাগকে সঙ্গে নিয়ে কুল বিক্রির টাকায় আরো বড় পরিসরে বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকারি সহযোগিতা পেলে আমাদের উপকার হবে এবং সহজেই বড় পরিসরে বল সুন্দরী কুল চাষ করতে পারব। ’

সরেজমিনে কুল বাগানে গিয়ে দেখা যায়, চলতি শীত মৌসুমেই রাকিবের বাগানের প্রতিটি গাছে অপূর্বভাবে অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী ছেঁয়ে আছে। অন্তত ৪ ফুট উচ্চতার একেকটি কুল গাছ। থোকায় থোকায় কুলের ভারে মাঠিতে নুয়ে পড়েছে কিছু কিছু ডাল। গাছ থেকে আপেল রঙের পাকা কুল নিয়ে দেখালেন বাগানের মালিক রাকিব। রঙটা ঠিক যেন আপেলের মতো সবুজ ও হালকা হলুদের ওপর লাল। খেতে খুব মিষ্টি।
বাগান দেখতে আসা নড়াইল-২ আসনের এমপি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) জামিল আহম্মেদ সানি (৩৫) বলেন,‘অল্প দিনে গাছে কুল ধরেছে বিষয়টি অবাক হওয়ার মতো। রাকিবের পরিশ্রমী উদ্যোগে সে আজ কুল চাষে সফল হয়েছেন।’

এ প্রসঙ্গে লোহাগড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইস উদ্দিন বলেন, ‘আমরা কুল চাষী রাকিবকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করে চলেছি। উপজেলায় এই প্রথম ব্যতিক্রমী অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী কুল চাষ করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন রাকিব। এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক একটি উদ্যোগ। এর মাধ্যমে এলাকার তরুণ-যুবকরা তার মতো আত্মনির্ভরশীল হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করবেন বলে জানান ওই কৃষি কর্মকর্তা।’