বঙ্গবন্ধুকে দাফনকারী নড়াইলের কাজী সিরাজুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত পেতে চান

289
191

স্টাফ রিপোর্টার

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ঘাতকের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দাফনকারী তৎকালীন পুলিশ সদস্য (কনষ্টেবল) নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাজী সিরাজুল ইসলাম (৭৪) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাত পেতে চান। এই সাহসী মানুষটি সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সামনে বলেছিলেন ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক মুসলিম রীতিতে বঙ্গবন্ধুকে গোসলসহ দাফন-কাফন করতে হবে।

সোমবার (১৮ জানুয়ারি) ইতনা গ্রামের নিজ বাড়িতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে গোসল করানোসহ দাফন-কাফনের সেদিনের মর্মস্পর্শী কাহিনীগুলো। এ সময় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আলী আজগর রাজা, শিক্ষক নারায়ন চন্দ্র বিশ্বাস, কাজী সিরাজুল ইসলামের বাল্যবন্ধু কাজী বাবুল হোসেন, বড় ছেলে শরিফুল ইসলাম, শিকদার ফারুক হোসেন, কাজী শরাফত হোসেনসহ গ্রামের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। কনষ্টেবল কাজী সিরাজুল ইসলাম (কনষ্টেবল নম্বর-২০৭৩) আরও বলেন, ১৯৭৫ সালের আগষ্টে গোপালগঞ্জ তৎকালীন সাব-ডিভিশন পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) আব্দুল মান্নানের দেহরক্ষী (বডি গার্ড) ছিলেন তিনি। ওই রাতে খাবার খেয়ে ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়ারপর রাত পৌঁনে ৩টার দিকে রেডিওর খবরে শুনি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। খবর শুনে ওই সময় পুলিশের পোশাক পরে গোপালগঞ্জের দিকে রওয়ানা হন তিনি। পরে তখনকার ম্যাজিষ্ট্রেট আব্দুল কাদের,এসডিপিও আব্দুল মান্নান এবং তিনি একটি স্পিডবোডে করে টুঙ্গিপাড়ায় যান। এরই মধ্যে জানতে পারলেন বঙ্গবন্ধুর জন্য কবর খোড়ার কাজ চলছে। বেলা আনুমানিক ১০টা-১১টার দিকে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ হেলিকপ্টার করে নিয়ে আসা হল টুঙ্গিপাড়ায়।

মরদেহের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একজন মেজর ও সিপাহীকে দেখা গেল। হাসপাতাল ও পুলিশের লোক মরদেহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে নিয়ে আসলো। তখন ওই মেজরের কাছে বলা হল,মনে হচ্ছে লাশের তো গোসল হয়নি। মেজর সাহেব রাগান্বিত স্বরে বললেন, কে কার গোসল করাবে।

তিনি বলেন, মুসলমান হিসেবে তাকে গোসল করাতে হবে, কাফন দিতে হবে। তারপর দাফন করতে হবে।তখন তিনি রেগে গিয়ে বললেন,আপনার বাড়ি কোথায়। তিনি জানালেন নড়াইলের লোহাগড়া থানার ইতনা গ্রামে। মেজর বললেন, দেরি করলে লাশ ছিনতাই হয়ে যেতে পারে। তিনি বললেন ১৪৪ ধারা জারি আছে। ফোর্স দিয়ে টুঙ্গিপাড়া ঘেরাও আছে। তিনি বললেন, গোসল কে করাবে, কত সময় লাগবে। তিনি বললেন, গোসল তিনি করাবেন এবং আধাঘন্টার মধ্যে হয়ে যাবে।তখন গোসল করানোর অনুমতি দিলেন মেজর।

বঙ্গবন্ধুর পরনে ছিল গাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। গোসল করানোর সময় বঙ্গবন্ধুর চাচাতো চাচা আব্দুল মান্নান টিনের দুটি পুরানো বালতি আর সিলভারের একটি বদনা নিয়ে আসলেন। গোসল করানোর জন্য আনা হলো ৫৭০ কাপড় কাচার সাবান।তখন এতো খারাপ লাগলো এই ভেবে বঙ্গবন্ধুকে গোসল করাতে হলো ৫৭০ কাপড় কাচা সাবান দিয়ে।একথা চিন্তা করতে দুচোখ দিয়ে পানি এলো। জাতির জনককে গোসল তিনি নিজ হাতে করালেন। বঙ্গবন্ধুকে গোসল করাতে গিয়ে দেখাগেল বুকের বামপাশে তিনটি গুলির চিহ্ন। আরেকটা গুলি ডান হাতের আঙ্গুলে লেগেছিল।গুলি লেগে আঙ্গুলটি উল্টে গেছে।

গোসলের পর কাফনের কাপড়ের দরকার। তখন ইতনা গ্রামের বাসিন্দা মোকলেছুর ছিলেন টুঙ্গিপাড়া থানার সেকেন্ড অফিসার। ওনি বললেন তিনি কাফনের কাপড় নিয়ে আসছেন।কাফনের জন্য যে কাপড় পাওয়া গেল সেটি মার্কিন থান কাপড়। এটি রিলিফের কাপড়। কাপড় জোড়া দিয়ে কাফনের কাপড় প্রস্তুত করা হলো। কাফন দেয়ার সময়ও বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। এরপর জানাযা অনুষ্ঠিত হলো। জানাযায় ২০-২৫ জন লোক ছিল। পুলিশ ষ্টাফ আর হাসপাতালের লোক জানাযায় অংশ নিলেন। জণসাধারনকে জানাযায় অংশ নিতে দেয়া হয়নি।

জানাযা শেষে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ দাফনের জন্য কবরের কাছে নিয়ে আস হল। জাতির জনকের মরদেহ তিনি নিজ হাতে কবরে রেখেছেন। কবরে বাঁশের স্তর দিয়ে ঢেকে দেয়া হল। এমন সময় কয়েকজন মহিলা ওই মেজরের হাত-পা ধরে কান্নাকাটি করছে এই বলে, তাদের যেন একবার বঙ্গবন্ধুর মুখটা শেষবারের জন্য দেখতে দেয়া হয়। মেজর বললেন না এখন দেখানো যাবে না। তখন তাদেরকে বলা হল আপনাদের বাড়ি কোথায়। তারা জানালো বাড়ি কাউলিপাড়া।

তখন তিনি বললেন ১০-১২ মাইল রাস্তা পার করে এরা কষ্ট করে এসেছে চোখের দেখা দেখতে।তখন মেজর বললেন, কে দেখাবে। তখন তিনি তাদেরকে লাশ দেখালেন। মেজর তার ওপর ক্ষেপে গিয়ে বললেন আপনিতো আচ্ছা লোক।লাশ আসার পর থেকে এর পিছনে লেগেই আছেন। তখন তিনি আবার কবরে নেমে তাদেরকে লাশের মুখ দেখালেন।উনারা বঙ্গবন্ধুর মুখ দেখেই হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন।তখন তিনি তাদেরকে বললেন আপনারা উনার জন্য দোয়া করেন। পরে দোয়া পড়ে কবর থেকে উঠে আসলেন পুলিশ সদস্য কাজী সিরাজুল ইসলাম।