শিক্ষাদান কর্মের উপাদানসমূহ কী কী? শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কী?

0
25
শিক্ষাদান কর্মের উপাদানসমূহ কী কী? শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কী?
শিক্ষাদান কর্মের উপাদানসমূহ কী কী? শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কী?

মীর আব্দুল গণি

উত্থাপিত প্রশ্ন ৩। শিক্ষাদান কর্মের উপাদানসমূহ কী কী? প্রথমে আমাদের জানা প্রয়োজন কর্মের উপাদান বলতে কী বোঝায়? অতি সহজে ও সংক্ষেপে উল্লেখ করা যায়- যেসকল উপকরণের (বস্তুগত, শ্রমজাত ও কৌশ’লগত) সমন্বয়ে কাজটি সম্পাদন করা হয়, সেই সকল উপকরণসমূহই হলো কাজটির উপাদান।

প্রশ্ন হলো- শিক্ষাদান কর্মের উপাদানসমূহ জানার উপায় কী? যেকোনো কাজের উপাদানসমূহ জানার উপায় হলো- কাজটি নিয়ে যথা সম্ভব সার্বিক প্রশ্ন উত্থাপন করা। কারণ আমরা অধিকাংশ কাজ যা সত্য বলে বিশ্বাস করি সেই কাজ সম্পর্কে সাধারণত গ’ভীরভাবে বিচা’র-বিবেচনা না করেই করে থাকি এবং এ ব্যাপারে খুব কমই প্রশ্ন তুলি।

প্রশ্ন না তোলার কারণ- কাজটি যেসকল উপাদান সম্পৃক্ত সেসকল উপদানসমূহকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে
দীর্ঘ ও জ’টিল বর্ণনায় ব্যক্ত না করে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। যেমন- ‘শিক্ষাব্যবস্থা’। শিক্ষাব্যবস্থা শব্দটি শিক্ষাদান কর্মের উপাদানসমূহের ভিন্ন ভিন্ন ও জটিল বর্ণনায় ব্যক্ত না করে অতি সংক্ষেপে শিক্ষাব্যবস্থা বলে উল্লেখ করা হয়।

ফলে ‘শিক্ষাদান ব্যবস্থা’ শব্দটি বিভিন্ন অর্থ ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উপাদান সম্পৃক্ত হয়েও শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হওয়াতে তার অর্থ, বৈশিষ্ট্য ও উপাদানসমূহ ঊহ্য থেকে যায়। শিক্ষা কেন জাতির মেরুদ’ণ্ড এবং মেরুদ’ণ্ডের বৈশিষ্ট্য কী জানতে হলে শিক্ষাব্যবস্থা শব্দটিতে অন্তর্নিহিত প্রতিটি উপাদান নিয়ে অবশ্যই বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে।

এ পর্যায়ে শিক্ষাদান কর্মের উপাদানসমূহ চিহ্নিত করার জন্য আমরা কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করব এবং প্রশ্ন-সম্পৃক্ত বিষয়সমূহ পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করব। উপাদান চিহ্নিতকরণ প্রশ্নসমূহ :
১ . শিক্ষা মূলত কী?
২ . শিক্ষার অর্থ কী?
৩ . শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কী?
৪ . শিক্ষাদানের প্রয়োজন ও প্রয়োজনীয় বিষয় কী?
৫. শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য কী?
৬. শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার গুরুত্ব কী?
৭. শিক্ষার্থীর সত্তাগত সক্ষমতা বিবেচ্য কী?
৮. শিক্ষার্থীর বয়স নির্বাচন প্রয়োজন আছে কী?
৯. শিক্ষকের বিবেচ্য ব্যক্তি বৈশিষ্ট্য ও শিক্ষাদানে যোগ্যতার গুরুত্ব কি?

শিক্ষাদান কর্মের উপাদানসমূহ চিহ্নিত করণে এ পর্যায়ে যে প্রশ্নসমূহ উত্থাপিত হয়েছে পর্যায়ক্রমে সেই সকল প্রশ্নসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করলেই উপাদান- সমূহ ও তার গুরুত্ব জানা যাবে। শিক্ষাদান কর্মের উপাদানসম্পৃক্ত উপরিউক্ত প্রশ্নসমূহ পর্যায়ক্রমে নিচে পর্যালোচনা করা হলো-

১ . শিক্ষা মূলত কী? শিক্ষা মূলত: কি বুঝতে হলে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে শিক্ষা ব্যক্তিস’ত্তায় (বা সত্তায়) বোধগত কী বৈশিষ্ট্য দান করে ? শিক্ষা মূলত কী এবং ব্যক্তিসত্তায় যে বোধগত বৈশিষ্ট্য দান করে তা আমরা এখন জানার চেষ্টা করব। মনে করি কোনো এক ব্যক্তি সে অঙ্কের কিছুই জানে না। তাকে প্রশ্ন করা হলো- ক- ১ + ১ = ? ২ – ১ = ? উক্ত ক্ষেত্র ব্যক্তি স্বেচ্ছায় যা (যে সংখ্যটি) প্রকাশ করত (ঠিক হবে তেমন নয়) তা হলো- ক- ১ + ১ = ?, ২ – ১ = ? স’ত্তার স্বকীয় বো’ধগত বা নিজস্ব উপলব্ধিজাত প্রকাশ ক্ষ*মতা বা আচরণ সক্ষ*মতা।

কিন্তু শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে দেখা যায় সত্তার স্বকীয় বোধগত উপলব্ধির (সংখ্যা) প্রকাশ বা আচরণ অগ্রাহ্য করে অঙ্কের পদ্ধতিগত দিক তুলে ধরে-তাকে খ- ১ + ১ = ২, ২ – ১ = ১ বলতে বা লিখতে শেখানো হয় বা তাকে আচরণ সক্ষ’ম করা হয়। উক্ত ক্ষেত্রে লক্ষণীয়- খ- ১ + ২ = ২, ২ – ১ = ১ হলো স’ত্তার শিক্ষাজাত বা উন্মেষিত আচরণ সক্ষ’মতা।

অর্থাৎ স’ত্তার বলতে ও লিখতে শেখা- খ- ১ + ১ = ২, ২ – ১ = ১ আচরণ হলো শিক্ষাদানের ফলে তার উন্মেষ সাধিত বোধগত আচরণ সক্ষ’মতা। শিক্ষাদানের ফলে সত্তার উক্তরূপ আচরণ বৈশিষ্ট্যে প্রতিয়মান হয় যে, শিক্ষা মূলত সত্তার স্বকীয় বোধগত ’ক’ উপলব্ধির স্থলে ‘খ’ কাঙ্ক্ষিত বোধের উন্মেষ সাধন করা। উপরিউক্ত আলোচনায় প্রতিয়মান হয় যে, শিক্ষা হলো কাঙ্ক্ষিত বোধের উন্মেষ সাধন যা স’ত্তাকে কাঙ্ক্ষিত আচরণে সক্ষ’ম করে তোলে।

২. শিক্ষার অর্থ কী? উক্ত প্রশ্নটি নিয়ে আমরা এ পর্যায়ে অতি সংক্ষেপে আলোচনা করব- শিক্ষার সহজ অর্থ জানা বা শেখা। মূলত যা কোনো কর্ম বা বিষয় সম্পাদনে সত্তার সক্ষ’মতার্জন বা যোগত্যার্জন বুঝায়।

৩. শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কী? আমরা লক্ষ করলে দেখতে পাব, ব্যক্তির জীবন-সম্পৃক্ত চাহিদার বিষয়সমূহ সম্পাদনের ওপর ব্যক্তির অস্তিত্ব ও তার জীবনযাত্রার মান নির্ভরশীল। উক্ত রূপ নির্ভরশীলতার কারণে ব্যক্তির জীবন-সম্পৃক্ত চাহিদার বিষয়সমূহ সম্পাদনের সক্ষ’মতা বা যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। জীবন-সম্পৃক্ত চাহিদার তাগিদেই মূলত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য রূপে দেখা দেয়। জীবন-সম্পৃক্ত চাহিদার তাগিদের- গুরুত্ব বুঝতে সহজ হবে যদি আমরা ব্যক্তির শিক্ষার্জিত সক্ষ’মতা বা যোগ্যতা প্রকাশের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করি।

ব্যক্তির শিক্ষার্জিত সক্ষ’মতা বা যোগ্যতা প্রকাশের বৈশিষ্ট্য ব্যক্তির শিক্ষার্জিত সক্ষ’মতা বা যোগ্যতা প্রকাশের বৈশিষ্ট্য লক্ষ করলে দেখা যায়, শিক্ষার্জিত সক্ষমতা বা যোগ্যতা ব্যক্তি দুটি ধারায় প্রকাশ করে থাকে।

যেমন- (১) বিষয়ভিত্তিক সম্পাদন সক্ষ’মতা (পেশাগত যোগ্যতা)। (২) নীতিগত আচরণ সক্ষ’মতা (নীতিগত আচরণশীলতা)। শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য মূলত উক্ত দুটি ধারায় সক্ষম বা যোগ্য করে তোলা এবং শিক্ষা গ্রহণ করার উদ্দেশ্য উক্ত দুটি ধারায় সক্ষ’মতা বা যোগ্যতা অর্জন করা।

উক্ত দুটি ধারায় ব্যক্তির সক্ষ’মতা বা যোগ্যতা অর্জনের উপমা তুলে ধরা যায়। যেমন- নিয়মিত বাহিনীতে একজন সৈ’নিককে যেমন কোনো স’মরা’স্ত্র নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো বিষয় সঠিকভাবে সম্পাদান করা শিখতে হয়। অ*স্ত্র পরিচালনা করা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত বিষয়টির সম্পাদান সক্ষ’মতাই হলো সেনার (ব্যক্তির) বিষয়ভিত্তিক সম্পাদন সক্ষ’মতা। অপরদিকে সে’নাবাহিনীর নিজস্ব বেশকিছু নিয়মনীতি বা অনুশা*সনের অধী’নে সে’না সদস্য বা সৈ’নিককে কাঙ্ক্ষিত আচরণশীল হতে হয়।

উক্ত রূপ কাঙ্ক্ষিত আচরণশীলতা হলো- সে’নার নীতিগত আচরণ সক্ষ’মতা। এখন আমরা যদি প্রতিটি সে’না সদস্যকে স্বতন্ত্র ব্যক্তিরূপে বিশ্লেষণ করি তবে দেখতে পাব- প্রত্যেক সদস্যের বিষয়ভিত্তিক সম্পাদন সক্ষ’মতা- যেমন- অ*স্ত্র পরিচালনা ও সমষ্টির নীতিগত আচরণশীলতা (সে’নাবাহীনির নিজস্ব নীতিনিয়মের আনুগত্যশীলতা) উক্ত উভয়বিধ আচরণ সক্ষ’মতার ভিত্তিতেই সুশৃঙ্খল বিশাল সে’নাবাহিনী গঠিত হয়েছে। ব্যক্তির উক্ত উভয়বিধ সক্ষ’মতা ব্যতীত সুশৃঙ্খল সে’নাবাহিনী গড়ে ওঠা সম্ভব নয়।

সুশৃঙ্খল সে’নাবাহিনী গড়ে ওঠার মূলে ব্যক্তির উক্ত উভয়বিধ সক্ষ’মতার গুরুত্ব অনুধাবন করলেই ব্যক্তি বা সমষ্টির জীবনযাত্রার মান তার জীবন সম্পৃক্ত বিষয় -সমূহের শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল যেমন সহজেই বুঝা যায় তেমনি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বোধগম্য হয়। (চলবে)

গঠনমূলক আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা
মীর আব্দুল গণি
জার্মানি প্রবাসী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here