নড়াইলে প্রতি বছরই গমের আবাদ আশঙ্কাজনক হারে কমছে

1
17

স্টাফ রিপোর্টার

নড়াইলে প্রতি বছরই আশঙ্কাজনকভাবে গমের আবাদ কমছে। গত চার বছরে জেলায় গমের আবাদ ৬ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় গমের দাম অনেক কম থাকা, তুলনামুলক ভাবে গম থেকে ধানের দাম বেশি থাকা, গমে ব্লাষ্ট রোগসহ  বিভিন্ন প্রকার রোগ বালায় আক্রমন হওয়ায় গমের আবাদ দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে কৃষকদের দাবী।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, এবার ১৮-১৯ মৌসুমে জেলার তিনটি উপজেলায় গমের আবাদ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩’শ ৩০ হেক্টর জমিতে। পূর্বের ৩ বছরের এক হিসেবে দেখা যায় ১৭-১৮ মৌসুমে ১ হাজার ৩৭০ হেক্টোর জমিতে, ২০১৬-১৭ মওসুমে ৪ হাজার ১২৪ হেক্টর জমিতে এবং ২০১৫-১৬ মৌসুমে ৬ হাজার ৩শ ২ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ হয়।

সদর উপজেলার চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের আমবাড়িয়া গ্রামের কৃষক তারা শেখ (৩৭) জানান, গত ৪ বছরে এলাকার ব্লক সুপারভাইজার কে, তার চেহারা কেমন তা দেখিনি। এখানে কৃষকদের সিআইজি  নামে কোন গ্রুপ আছে কিনা তাও জানিনা। গত বছর আমাদের গ্রামে এক কৃষককে গমের দেয়া হলেও সে গমের চাষ না করে ভেজে খেয়েছেন বলে জানান।

নড়াইল পৌরসভার মথুরাপুর এলাকার কৃষক বিকাশ বিশ্বাস (৩৫) জানান, প্রতি বছর আমি গমের আবাদ করলেও এ পর্যন্ত কোনো গমের বীজ পাইনি।

নড়াইল শহরের রূপগঞ্জ বাজারের খুচরা সার ও কীটনাষক ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান মুকুল এ প্রতিনিধিকে জানান, ছত্রাকজনিত ব্লাষ্ট রোগের কারণে গমের আবাদ কমছে। ছত্রাকনাষক ওষুধ দিলেও কাজ হয়না।  গমের আবাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এ রোগ প্রতিকারে তেমন কোনো ভালো ব্যবস্থা না থাকায় সরকার গমের আবাদে উৎসাহ কমিয়ে দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

সদরের আউড়িয়া ইউনিয়নের তালতলা গ্রামের কৃষক মোসলেম মুন্সি জানান, এক মন গম উৎপাদন করতে ৬শ টাকা খরচ হলে বাজারে প্রতি মন গম বিক্রি হয় মাত্র ৬শ থেকে সাড়ে ৬শ টাকায়। সরকারী ভাবেও যথা সময়ে গম কেনা হয়না। ফলে কৃষকরা গমের আবাদ থেকে সরে আসছে।

সদরের মাইজপাড়া ইউনিয়নের কৃষক বাদশা মোল্যা জানান, বাজারে গমের থেকে ধানের চাহিদা বেশি। সে জন্য তার মত অনেক কৃষক দিন দিন গমের আবাদ ছেড়ে দিয়ে অন্য ফসলের আবাদ করছে।

লোহাগড়া উপজেলার নলদী ইউনিয়নের  মিঠাপুর গ্রামের কৃষক মন্নু মোল্যা জানান, বর্তমানে বাজারে এক কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৪৮ টাকা, এক কেজি আটা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২৫/২৬ টাকা। বাজারে আটার দাম কম থাকায় গমের আবাদ দিন দিন ছেড়ে দিচ্ছে।

কালিয়া উপজেলার চাচুড়ি গ্রামের কৃষক মশিয়ার জানান, তাদের এলাকায় এক সময় প্রতি ঘরে ঘরে গমের আবাদ হতো। কিন্তু এখন এখানে গমের আবাদ হয়না বললেই চলে। কারণ গমের জমিতে বিভিন্ন প্রকার পোকার উপদ্রব দেখা দিলেও ব্লক সুপারভাইজারদের পরামর্শ তেমন একটা পাওয়া যায় না। আবার নিজেদের ইচ্ছামত কিটনাশক দিয়েও সে রোগ দমন করা যায়না। ফলে গমের আবাদ থেকে কৃষক সরে এসেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নড়াইলের উপ-পরিচালক চিন্ময় রায় বলেন, গমের আবাদ কমার পেছনে ব্লাষ্ট রোগ একটি অন্যতম কারণ।  তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে গমের আবাদ শেষ করে বোরো চাষে যাওয়া সম্ভব হয়না। সেখানে অনেক কৃষক সরিষার আবাদ করে বোরা আবাদে যেতে পারছে। এসব কারণেও গমের আবাদ কমতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে গমের আবাদের জন্য নতুন ৩০ জাতের বীজ এনে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।

তিনি ব্লক সুপারভাইজারদের ভূমিকার ব্যাপারে বলেন, প্রত্যেক ইউনিয়নে কৃষকদের ১০টি সিআইজি (কমন ইন্টারেস্ট গ্রুপ) রয়েছে। এরা দলভিক্তিকভাবে কৃষকদের বিভিন্ন চাষের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। কাউকে এককভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়না। ব্লক সুপারভাইজাররা এসব বিষয় তরারকি করে থাকেন। তবে অনেক ইউনিয়নে এ পদ শূন্য থাকার কারনে সাময়িক সমস্যা হতে পারে।